ষাড়ের লড়াই
কিছুদি আগে গিয়েছিলাম মাদ্রিদ, স্পেনের রাজধানী। কিছুদিন সেখানে ভ্রমন করার জন্য দেশে ফিরতে চাইলাম। কিন্তু স্পেনিয়াড বন্ধু ডিকস্টা আরও ২দিন থাকার অনুরো করলে ফেলতে পারলাম না। অগত্যা আমাকে থেকে যেতে হল। কারন স্পেনের জাতীয় খেলা হল বুল ফাইটং। প্রতি বছর উৎসবের সাথে এই খেলাটা হয়। এবারও সেই ধারাবাহিকতায় খেলাটি আগামিকালই হবে।
পরদিন সকাল 10.00 টার দিকে খেলা দেখার উদ্দ্যেশে রওনা হলাম আমি আর ডিকস্টা। খেলা হবে স্পেনের জাতীয় ষ্টেডিয়াম মাঠে। যথা সময়ে খেলা শুরু হল। ষাড়ের সাথে যারা খেলা করে তাদের মাতাদোর বলা হয়। প্রথমে একটি মোটা-তাজা ষাড় মাঠে আনা হল। তার সাথে খেলবে একজন মাতাদোর। তিনি অনেক অভিজ্ঞ পুরাতন খেলোয়াড়। তার ৫ বছর খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
একদিকে মাতাদোর একটি লাল কাপড় হাতে নিয়ে ষাড়ের দিকে তাকিয়ে ভিভিন্নভাবে ভেঞ্চি করতে লাগলেন আর সেই সাথে লাল কাপটি নাড়তে লাগলনে। ষাড়টি তা দেখে উত্তেজিত হয়ে মাতাদোরের দিকে তেড়ে গেলেন। ষাড়টিকে ফাঁকি দিয়ে একদিকে সরে গেলেন। টার্গেট মিস হওয়াতে ষাড়টি আরও উত্তেজিত হয়ে মাতাদোরকে দ্বিগুন আক্রোসে আক্রমন করলেন। কিন্তু এবারও মাতাদোর লাফ দিয়ে সরে দাড়ালেন। এভাবে বার বার ফাঁকিতে পড়ে একসময়ে রণে ভঙ্গ দিয়ে ষাড়টি চুপ করে দাডিয়ে রইল।
এভাবে 10/12 টা ষাড়ের খেলা দেখলাম, ভালই লাগছিল। অমরাও খেলার শেষের দিচে চলে আসলাম। শেষ রাউন্ডে নাকি ভিষণ মারাত্মক খেলা হবে। সত্যিই তাই। মাঠে ছেড়ে দেয়া হল এক বিড়াট আকৃতির ষাড় যা আগেরগুলোর তুলনায় অনেকটাই বড়। দেখে রিতিমত ভয় পেয়ে গেলাম। মাইকে ঘোষণা করা হল এই ষাড়ের সাথে লড়াই করার মত কোন মাতাদোরই নাকি সারা স্পেনে নাই। সেই সাথে এটাও ঘোষণা করা হল যে,- যে কোন বেক্তি এই ষাড়ের সাথে লড়াই করার জন্য সাহস দেখাতে পারে। যদি কোন বেক্তি এই ষাড়ের সাথে লড়াই করে জিততে পারে তবে তাকে 5 হাজার পেশো পুরস্কার হিসাবে দেয়া হবে। (টাকাকে স্পেনে পেশো বলে।) অবাক হয়ে দেখলাম আমার পাশ থেকে তালপাতার সিপাই আকৃতির একজন দাড়িয়ে এই চ্যলেঞ্জ গ্রহণ করলেন। তাকে কিছুলোক ধরাধরি করে কর্তৃপক্ষের সামনে দাড় করিয়ে দিলেন। তার শারীরিক অবস্থা দেখে কর্তৃপক্ষতো তাকে এই ফাইটের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করলেন। কিন্তু লোকটির পিড়াপিড়িতে অবশেষে অনুততি দেয়া হল এই শর্তে, ষ্ট্যাম্পের উপর স্বাক্ষর করে, “তার মৃত্যুর জন্য কেবল তিনিই দায়ি থাকবেন, কর্তৃপক্ষ নহে।”
অবশেষে খেলার পালা,- অবাক হয়ে দেখলাম সেই তালপাতার সিপাই একটি লাল কাপড় হাতে নিয়ে অন্য মাতাদোরদের মত ভেঞ্জি করতে লাগলেন। ষাড়টিকে দেখে মনে হচ্ছিল নিশ্বাসের সাথে আগুন বের হচ্ছে। ভিষণ মারমুখি হয়ে ষাড়টি লোকটির দিকে তেড়ে এল। কাছাকাছি হতেই মুহুর্তের মধ্যে লোকটি ষাড়ের পেটের নিচে বসে পড়লেন।তখন আমার মনে হয়েছিল ষাড়ের পায়ের তলায় লোকটি পিষ্ঠ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু পরক্ষনেই দেখি দৌড় দিয়ে মাঠের অন্য প্রান্তে চলে গেলেন। টার্গেট মিস হওয়াতে ষাড়টি ভিষণ ক্ষেপে গিয়ে মহা আক্রোশে লোকটিকে আবারও আক্রমন করল। এবারও লোকটি একই কাজ করল। ষাড়টি এবার কৌশল পরিবর্তন করে নিচু হয়ে লোকটিকে গুতা দেওয়ার চেষ্টা করল। ইদুরের মত এবারও লোকটি ষাড়ের গায়ের উপর দিয়ে পিছনে চলে গেল। লোকটি যখন দেখল ষাড়টি ভিষণ বুদ্ধিমান বেশিক্ষন এভাবে তাকে ফাঁকি দেয়া যাবে না তখন লোটি একটি ফন্দি করল। হঠাৎ দেখি লোকটি ষাড়টির পিছনে গিয়ে তার লেজ ধরে ঝুলে রয়েছে আর ষাড়টি তাকে ধরার জন্য ঘুরতে থাকল বনবন করে। কিন্তু কিছুতেই ষাড়টি লোকটির নাগাল পাচ্ছিল না। এভাবে বেশ কিছু সময় ঘুরে ঘুরে ষাড়টির মাথা ঘুরে গেল অবশেষে সে পাটিতে লুটিয়ে পড়ে গেল। এ দেখে ম্যানেজিং কমিটির লোকেরা দৌড়ে এসে ষাড়টিকে ইনজেকসন দিল কয়েকটা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। কর্তৃপক্ষ কিছুতেই লোকটির এই বিজয় মেনে নেবে না। তাদের মতে ফাঁকি দিয়ে জেতা হয়েছে। অবশেষে দর্শকদের হৈচৈতে এবং মামলার ভয় দেখানোতে কর্তৃপক্ষ মেনে নিতে বাধ্য হল। তবে তাদেরও কিছু শর্তও লোকটিতে মানতে হয়। 5000 পেশোর পরিবর্তে 2500 পেশো লোকটিকে দেয়া হয়েছিল।
পরে শুনেছিলাম বুল ফাটিং খেলায় আইনের বেশ কিছুটা পরিবর্তন এনেছিল কর্তৃপক্ষ। লেজ ধরে ঝুল খেলা করা যাবে না। তবে এই খেলা দেখে আমিও ভিষণ আনন্দ পেয়েছিলম। শেষ।

0 Comments